অনেকদিন ধরে একটা কোনো জিনিস টানা পড়ে লিখব ভাবছি, সে আর লেখা হয় না। কিন্তু এই অষ্টাবক্র গীতাটার একটা সহজ গল্পের ভাষ্য লিখব ভেবেছি, সেও আর করা হয়ে উঠছে না। খানিকটা লিখছি বটে, কিন্তু তারপর আর সেটা পুরো লেখা হয়ে উঠছে না। কিন্তু আমার কাছে তেমন কোনো বই নেই যে, তো আপাতত কাজ হচ্ছে যে কিছু ভালো বই খুঁজে বের করা আর তারপর পুরো জিনিসটাকে গল্পে রূপান্তর করা। এই পোস্টটা পাবলিশ করে রাখব।অল্প অল্প করে আপডেট করতে হবে।
আমি পাবলিশ করে রাখছি ঠিক। আশা করছি আমার ব্লগ কেউ পড়ে না, কারণ বানান ভুল এবং ইত্যাদি ইত্যাদি আছে। সেগুলো আর ঠিক করছি না।
জনক
সে বহুদিন আগেকার কথা।পাঁচশত খ্রিস্টপূর্বাব্দ। তখন নগরীর নাম মিথিলা। এখনকার নেপালের দক্ষিণপ্রান্তে, বিহার ঘেঁষা। রাজার নাম জনক। ইক্ষ্বাকুর পুত্র নিমি, নিমির পুত্র জনক। নিমি রাজা হওয়ার পর যজ্ঞ করেছিলেন এক। সে এক বিশাল যজ্ঞ আয়োজন করেছিলেন বটে। আমন্ত্রণ জানালেন গুরু বশিষ্ঠকে, যজ্ঞের দায়ভার নেওয়ার জন্যে। বশিষ্ঠ প্রত্যাখ্যান করলেন না, কিন্তু বললেন ইন্দ্রের যজ্ঞের সভায় তার আমন্ত্রণ, সেখানের দায়ভার মিটিয়ে তবে তিনি হাত দেবেন নিমির যজ্ঞে। জনক যথেষ্ট বিরক্ত হলেন, কিন্তু তা গুরুর সামনে প্রকাশ করেন কেমন করে। তাই চুপ রইলেন। আর এও ভাবলেন যে যজ্ঞ তিনি করতে চলেছেন তা করতে সময় লাগবে বহুকাল, তিনি বেঁচে থাকবেন কিনা তাইবা কে জানে। এপাশে বশিষ্ঠ ভাবলেন জনক বোধহয় মেনে নিয়েছেন, তিনি চলে গেলেন ইন্দ্রের সভায়। জনক এপাশে গুরুর অবর্তমানে অন্য ব্রাহ্মণদের আমন্ত্রণ করে যজ্ঞ শুরু করে দিলেন। বশিষ্ঠের যজ্ঞ শেষ হতে দেরী হল না তেমন, ফিরলেন তিনি ইন্দ্রের সভা থেকে। এসে দেখলেন যজ্ঞ শুরু হয়ে গেছে। বশিষ্ঠ অল্পেতেই রেগে যেতেন, কিন্তু এ তো রীতিমত কথার খেলাপ। ভয়ংকর অপমানিত বোধ করলেন, যজ্ঞ বেদীর সামনে দাঁড়িয়ে নিমিকে বললেন, তুমি সামান্য ক্ষত্রীয় হয়ে কুলগুরুরর কথা অমান্য করলে, এর শাস্তি মৃত্যু, আমার অভিশাপ মৃত্যু। কিন্তু নিমিও সহজ জিনিস নন, স্পষ্ট ভাষায় বললেন যে আপনিও কুলগুরু হয়ে, সম্পদের লোভে ইন্দ্রের সভায় গেছেন, আপনি ধর্মচ্যুত হয়েছেন, আমার মৃত্যু হলে আপনারও মৃত্যু হোক। সেই সময় এইসব অভিশাপ ফলে যেত সাথে সাথেই। মৃত্যু হলো নিমির, বশিষ্ঠেরও। ব্রাহ্মণেরা, যারা পূজা করছিলেন, তারা পড়লেন বড় আতান্তরে, নিমি মারা গেছেন, যজ্ঞ হয় কিকরে, এপাশে যজ্ঞ মাঝরাস্তায় থামানোও যায় না। তারা দেবতাদের কাছে প্রার্থনা করতে লাগলেন নিমির প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু আকাশ থেকে তারা নিমির স্বর শুনতে পেলেন, আমি আমার শরীর থেকে মুক্তি লাভ করেছি, আমার জড়বৎ শরীর ত্যাগ করতেই হত, তা আমি আর ফিরতে চাই না। তা দেবতারাও শুনলেন, বললেন ভালো কথা নিমি, তোমার ইচ্ছে পূর্ণ হোক, তোমাকে আর তোমার নশ্বর দেহে ফিরতে হবে না, কিন্তু তোমার ধার্য জীবৎকালে তোমাকে পৃথিবীতে বাস করতে হবে, সুতরাং তুমি মানুষের চোখ দিয়ে দেখবে। এই কারণে নাকি নিমি আমাদের চোখে দেখার সাথে যুদ্ধ করেন আর সেই কারণেই চোখের পাতা পরে বারবার। সে যাহোক, এদিকে ব্রাহ্মনদের আরেক সমস্যা দেখা দিল, তাহলে রাজা কে হবেন, তারা নিমির মৃতদেহে ঘি মাখিয়ে মন্ত্রোচ্চারণ করতে থাকলেন খুব, আর দেহ মর্দন করতে থাকলেন, তা থেকে জন্ম নিল এক বাচ্চা, এই বাচ্চার নাম রাখলাম তারা জনক, কারণ সে নিজেই নিজের পিতা, আর সব থেকে আসল বলে নাম রাখলেন বৈদেহ, আবার মর্দনের ফলে বাচ্চা জন্মানোয় আরেক নাম হল মিথিলা। এই বংশের রাজাদের নাম এরপর থেকে সবাই জনক। এদের উত্তরসূরি শিরোধব্জও এক যজ্ঞের আয়োজন করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তখন রাজ্যের বাইরে জমি কর্ষণ করতে গিয়ে তিনি এক বাচ্চা মেয়েকে পান। এই মেয়ের নামই সীতা। সে যাহোক সেই গল্পে আমরা যাব না।
অষ্টাবক্র
আমাদের গল্প বরং শুরু হোক উদ্দালক আরুনির শিষ্য কাহোলাকে নিয়ে। অনেক একে কাহোড় বলেও চেনেন। উদ্দালক অরুনির গল্প আমরা জানি, অত্যন্ত সদাচারী, গুরুর কথা মেনে চলার গল্প। তা কাহোলার বেদের জ্ঞানে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়ে তিনি কাহোলাকে তিনি নিজের মেয়ে সুজাতার সাথে বিয়ে দেন। তা সুজাতা যখন গর্ভধারিনী, তখন কাহোলা তার সাথে সময় কাটানোর জন্য বেদ শেখাতেন তাকে। মাঝখান থেকে সুজাতা কিছুদিন বাপের বাড়ি থেকে ঘুরে এসেছেন। তা শেখাচ্ছেন একদিন এরকম, এই পড়ানোর মাঝেই উচ্চারণে ভুল হয়েছিল কোথাও, পেটের বাচ্চা ভুল বলে ভুল শুধরে দিল। পেটে থাকাকালীনই সে উদ্দালক অরুণীর কাছ থেকে শুনে এসব শিখে নিয়েছে যখন সুজাতা বাপের বাড়ি ছিলেন। বোঝা যেত ছেলের বয়েস হয়েছে এবং বাবার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবার সময় এসেছে, তখন না হয় বিদ্রোহ করল, এ তো পেটের মধ্যে থেকেই ভুল ধরা শুরু করেছে। কাহোলা তো যাকে বলে রাগে কমলা হয়ে যাওয়ার মত। তিনি অভিশাপ দিলেন, বেয়াদব ছেলে তুই পেটের মধ্যে থেকে বাবার বিরুদ্ধে কথা বলিস! তুই তো হাড় জ্বালানো ছেলে হবে রে! তোকে অভিশাপ দিলাম তুই তোর আটটা বেঁকা হাড় নিয়ে জন্মাবি। তা যাহোক, এ অভিশাপ ফলবে ঠিক সময়ে। বাকি যা চলছিল ভালোই, কিন্তু কাহোলা গরীব পরিবারের সন্তান। ঘর গেরস্থালির অবস্থাও একান্ত যারপরনাই। তার চলত যজ্ঞ করে আর রাজদরবারে হাত পেতে, তার শিক্ষিত হিসেবে নাম ছিল। ব্যস্ত থাকতে ভালোবাসতেন নিজের অধ্যয়ন নিয়ে। যখন সুজাতা দশমাসের সন্তানসম্ভবা, তখন কাহোলাকে বললেন ঘর যে আর চলে না। কিছু অর্থ উপার্জনের ব্যবস্থা করুন। সন্তানও আসতে চলেছে, তার প্রতিপালনের খরচপাতিও দরকার। অগত্যা কাহোলা চললেন রাজদরবার। রাজা জনকের দরবার। সেখানে জ্ঞানী গুণীর সমাহার। বন্দিন নামের এক বাগ্মী আছেন সেখানে, তিনি জ্ঞানীদের তর্কযুদ্ধে আহ্বান করেন। তাকে হারাতে পারলে মেলে খেতাব আর উপঢৌকন। কিন্তু শর্ত আছে ভয়ংকর। তর্কযুদ্ধে হারলে তাকে সঙ্গম নদীতে ডুবে মরতে হবে। কাহোলা তর্কযুদ্ধে হারলেন, শর্তস্বরূপ তাকে ডুবে মরতে হল নদীতে। এখানেও গল্প আছে কিছু। আসলেই কি মরলেন? ফেরত আসব আবার পরে সেই গল্পে।হাহাকার নিয়ে সুজাতা ফেরত গেলেন বাপের বাড়ি। যথাসময়ে ছেলে জন্মালো, কাহোলার অভিশাপ সমেত।তার শরীরের আটটি হার বেঁকা। তাই তার নাম হল অষ্টাবক্র। সেখানে অরুণীর কাছেই মানুষ হলেন তিনি। তিনি তার বারো বছর অবধি জানতেন উদ্দালকই তার বাবা, আর উদ্দালকের ছেলে শ্বেতকেতু তার ভাই। একদিন উদ্দালকের কোলে বসে আছেন, শ্বেতকেতু এসে বায়না ধরল, সে বাবার কোলে বসবে।কিন্তু অষ্টাবক্রও ছাড়বে কেন, সেও নড়বে না। কিছুক্ষন খিটিমিটি বাধার পর শ্বেতকতু কিছুতেই এটে উঠতে না পেরে বলল উদ্দালক তার বাবা, সে তার বাবার কোলে বসব, অষ্টাবক্র নিজের বাবার কোলে গিয়ে বসুক যে যাক। অষ্টাবক্র প্রথম জানল যে উদ্দালক তার বাবা নয়। তা জেনে সে কাঁদতে কাঁদতে মাকে গিয়ে ধরল, বলল বলো আমার বাবা কে। কোথায় আমার বাবা। সুজাতা বুঝিয়ে বললেন সব। অষ্টাবক্রের চোয়াল শক্ত হল। সে রাজদরবার যাবে, বন্দিনকে তর্কে হারাতে হবে তাকে।নিতে হবে পিতার মৃত্যুর প্রতিশোধ। এই জায়গায় আরো খানিক গল্প আছে, কিকরে সে রাজার কাছে পৌঁছাল। সে গল্প যারা জানতে ইচ্ছুক পড়ে নেবে। তা অষ্টাবক্র যখন রাজার সভায় ঢুকছে, সবাই তার অদ্ভুত ভাঙাচোরা চেহারা দেখে হেসেই অস্থির। বারো বছরের অদ্ভুত ভঙ্গিমার বালককে রাজসভায় প্রবেশ করতে দেখে লোকে হাসবে বটে, তাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু সে রাজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল, তারপর বলল, মহারাজ আমি তো ভেবেছিলাম পন্ডিতদের সভায় প্রবেশ করেছি, কিন্তু যারা দেহ দেখে মানুষের বিচার করে তারা তো মুচীরও অধম। মহারাজ বারো বছরের বালকের মুখ থেকে এত স্পষ্ট বাক্য শুনে অবাকই হলেন, কিন্তু বাকি সভাসদদের রুষ্টও করতে চাইলেন না। বললেন, কে তুমি? কি চাও ? অষ্টাবক্র স্পষ্ট উত্তর দিল, আমি বন্দিনের সাথে তর্কযুদ্ধে লড়তে চাই। মহারাজ আরো অবাক হলেন, বারো বছরের বালক, সে কিনা লড়তে চায় বনদিনের সাথে! সে তো এক অসম যুদ্ধ, তারও আগে, এ বালক সম্পর্কে তিনি জানেনও না কিছু। মহারাজ বললেন, কে তুমি? অষ্টাবক্র বললো, আমি ঋষি কাহোলার পুত্র অষ্টাবক্র। আমার পিতার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে চাই। মহারাজ বললেন, তুমি জানো তাহলে তর্কযুদ্ধে পরাজয়ের ফল কি, কিন্তু সে তো অসম যুদ্ধ হবে। সে আমি হতে দিতে পারি না। অষ্টাবক্র বলল, মহারাজ, আপনি যাচাই করে নিন আমি উপযুক্ত কিনা! মহারাজ ভাবলেন আচ্ছা জ্বালা, এ তো কিছুতেই ছাড়ে না। বাচ্চা বটে, তবে কথাবার্তা স্পষ্ট, তায় বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে এসেছে। যাচাই করতেই হয়। মনে প্রশ্ন ভেবে নিলেন শিরোধব্জ। বললেন বলো দেখি কার ৩৬০ টা শিক, ১২ টা ভাগ, ২৮ টা সন্ধি আর ৩০ অংশ? অষ্টাবক্র বলল, মহারাজ সময় আপনার সাথে থাক, আপনি যার কথা বলছেন, তা আর কিছু নয়, কালচক্র। মহারাজ ভাবেননি এর উত্তর এই বালকের মুখ থেকে পেয়ে যাবেন, এর পর তিনি পরপর আরো কয়েকটা প্রশ্ন করলেন। বল তো কে চোখ খুলে ঘুমায় ? কার প্রাণ নেই? জন্মের পর নড়ে না কে? কি নিজের বেগে বাড়ে ? অষ্টাবক্র পরপর উত্তর করলেন, মাছ, পাথর, ডিম, নদী। সমস্ত প্রশ্নের উত্তর সঠিক। মহারাজ ফাঁপরে পড়লেন, কিন্তু যোগ্যতার খাতিরে সে লড়তে চাইছে, তাকে আর না বলা যায় না। তিনি আদেশ দিলেন বন্দিনকে রাজসভায় নিয়ে আসার জন্যে।
তর্কযুদ্ধ
জনকের প্রশ্ন
টীকা:
১. হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে সাধারণত প্রতি ৩২ মাস অন্তর যে অতিরিক্ত চান্দ্র মাস বা "অধিকমাস" আসে, তাকেই মল মাস বা পুরুষোত্তম মাস বলা হয়।
২. আমার শেষ লাইনটা উপেন্দ্রকিশোরের প্রতি আমার ভালোবাসা। বাবা ছোটবেলায় উপেন্দ্রকিশোর রচনাসমগ্র কিনে দিয়েছিল, তাতে মনে পড়ে কিছুটা ছোটদের পুরান ছিল। পরে বড় হয়ে ছোটদের রামাযান, ছোটদের মহাভারত পড়েছি। কিন্তু একেবারে বাচ্চা বয়সে জন্মদিনের সেই বইটার স্মৃতি গল্পে ডুবে যাওয়ার একটা ভয়ানক আনন্দের কথা মনে করায়।
2. https://www.vyasaonline.com/2018/04/27/ashtavakra/mahabharata/#:~:text=He%20was%20there%20defeated%20in,it%20a%20secret%20from%20Ashtavakra.%E2%80%9D
3. https://indiaspiritual.wordpress.com/2020/04/04/ashtavakra-and-vandin/#:~:text=Vandin%20said%20that%20he%20was,discipline%20or%20philosophy%20of%20Vedanta.
No comments:
Post a Comment