সস্তার সমুদ্র। কলকাতার রাস্তায় জল জমেছে। এতো বৃষ্টি হয়েছে ক'দিন। লিন্ডসে স্ট্রিট জলে জলাকার। সুনীল শিয়ালদা গেছিলেন। সেখানেও জল জমে গেছে। সুনীল এর গায়ে নতুন পাঞ্জাবি। জলে ভিজে গেছে নীচে। পাজামা পায়ের সাথে সেঁটে আছে। দুটো কবিতা আছে পাঞ্জাবির পকেটে। ভেজেনি। ফুটপাতে জল ছপছপ করে এগিয়ে সিগারেটের দোকানে দাঁড়ালেন। একটা সিগারেট কিনলেন। পকেটে রেখে দিলেন। তারপর আবার ছপছপ শব্দ তুলে এগোতে লাগলেন কলকাতার সমুদ্রে। সুনীলের কোনো কাজ নেই আজ। সারাদিনের কলকাতা দেখবেন বলে বেড়িয়েছেন। একবার ভাবলেন কবিতাটা না আনলেই হত। ছুটির দিনে কবিতার দরকার নেই কোনো। যাকগে পরে ফেলে দিলেই হবে। কলকাতায় ই ভাসিয়ে দেওয়া যাবে। সব কবিতা ছাপানোর দরকার কি।
নীললোহিত যে সময় ধর্মতলা মোড় দিয়ে এগোচ্ছে সেই সময় দেখতে পেল ভারী দেহে সাদা পাঞ্জাবি চড়িয়ে সুনীল আসছেন। একা। একা তো থাকেন না আজকাল বেশী। সুনীলদা যদি কৃত্তিবাসে একটা কবিতা ছাপেন, একটু কথা বলে নিলে বেশ হয়। নীলু এগিয়ে গেলো।
-" আরে সুনীলদা , কোথায় যাচ্ছেন? "
সুনীল চিনতে পারলেন না। তবে ছোকরার চেহারা দেখেই বুঝতে পারলেন নির্ঘাত কবিতা নিয়ে এসেছে পকেটে। চোখে সামান্য গলে যাওয়া ভাব। বললেন ," এই ঘুরে আসি একটু। সামনে দরকার আছে। তোমায় কোথায় যেন দেখেছি ? "
-" সুনীলদা বইমেলায়। লিটল ম্যাগাজিন স্টলে। ইয়ে.. সুনীলদা আপনারা কি কৃত্তিবাস এর জন্য এখনো লেখা নিচ্ছেন ? "
সুনীল ভাবলেন ঠিক ই ধরেছেন। সস্তা জামা সস্তা প্যান্ট। পকেটের কোন থেকে কাগজ উঁকি দিচ্ছে, কলকাতা এরকম কবিতে ভরে আছে। বললেন, " আমি তো আর সম্পাদক না। লেখা নিচ্ছে। তুমি পাঠিয়ে দাও। "
-" আচ্ছা। "
-" আমি আসি তাহলে ? পরে দেখা হবে। "
সুনীল এগিয়ে গেলেন। নীলুর একটু মন খারাপ হলো। চুপি চুপি মন খারাপ। সুনীলদা একবারও নিজে লেখা পড়তে চাইলেন না। একবার বলতে তো পারতেন দেখিয়ো তোমার লেখা। যাক, সব দুঃখ উড়ে যাক। নীলু রানীর কাছে যাবে।
রানী বাড়ি নেই। কিছুক্ষন সমীরের বাড়িতে আড্ডা মেরে যখন নীলু উঠলো, কলকাতা সামান্য চুপ হয়েছে। মন খারাপ। আড্ডা জমেনি। নীলুর খুব অভিমান হয়েছে রানীর প্রতি। রানী আজ দেখা করতে বলেছিলো। আজ নীলুর মনখারাপ, তবু রানী নেই। নীলুর আরো মনখারাপ হলো, অভিমান হলো রানীর প্রতি, যেন সুনীলের কবিতা না পড়ার দোষও রানীর। সমীরের বাড়ির সামনের রাস্তায় জল। নীলু পকেট থেকে ভাঁজ করা কাগজটা বের করলো। এই কবিতাটা অনায়াসে প্রেমপত্র বলে চালিয়ে দেয়া যেত রানীর জন্য। নীলু ভীষণ অভিমানে ভাঁজ খুলে কাগজটা ভাসিয়ে দিলো।