Monday, April 6, 2026

অষ্টাবক্র

অনেকদিন ধরে একটা কোনো জিনিস টানা পড়ে লিখব ভাবছি, সে আর লেখা হয় না। কিন্তু এই অষ্টাবক্র গীতাটার একটা সহজ গল্পের ভাষ্য লিখব ভেবেছি, সেও আর করা হয়ে উঠছে না। খানিকটা লিখছি বটে, কিন্তু তারপর আর সেটা পুরো লেখা হয়ে উঠছে না। কিন্তু আমার কাছে তেমন কোনো বই নেই যে, তো আপাতত কাজ হচ্ছে যে কিছু ভালো বই খুঁজে বের করা আর তারপর পুরো জিনিসটাকে গল্পে রূপান্তর করা। এই পোস্টটা পাবলিশ করে রাখব।অল্প অল্প করে আপডেট করতে হবে। 

আমি পাবলিশ করে রাখছি ঠিক। আশা করছি আমার ব্লগ কেউ পড়ে না, কারণ বানান ভুল এবং ইত্যাদি ইত্যাদি আছে। সেগুলো আর ঠিক করছি না। 

জনক 

সে বহুদিন আগেকার কথা।পাঁচশত খ্রিস্টপূর্বাব্দ। তখন নগরীর নাম মিথিলা। এখনকার নেপালের দক্ষিণপ্রান্তে, বিহার ঘেঁষা। রাজার নাম জনক। ইক্ষ্বাকুর পুত্র নিমি, নিমির পুত্র জনক। নিমি রাজা হওয়ার পর যজ্ঞ করেছিলেন এক। সে এক বিশাল যজ্ঞ আয়োজন করেছিলেন বটে। আমন্ত্রণ জানালেন গুরু বশিষ্ঠকে, যজ্ঞের দায়ভার নেওয়ার জন্যে। বশিষ্ঠ প্রত্যাখ্যান করলেন না, কিন্তু বললেন ইন্দ্রের যজ্ঞের সভায় তার আমন্ত্রণ, সেখানের দায়ভার মিটিয়ে তবে তিনি হাত দেবেন নিমির যজ্ঞে। জনক যথেষ্ট বিরক্ত হলেন, কিন্তু তা গুরুর সামনে প্রকাশ করেন কেমন করে। তাই চুপ রইলেন। আর এও ভাবলেন যে যজ্ঞ তিনি করতে চলেছেন তা করতে সময় লাগবে বহুকাল, তিনি বেঁচে থাকবেন কিনা তাইবা কে জানে। এপাশে বশিষ্ঠ ভাবলেন জনক বোধহয় মেনে নিয়েছেন, তিনি চলে গেলেন ইন্দ্রের সভায়। জনক এপাশে গুরুর অবর্তমানে অন্য ব্রাহ্মণদের আমন্ত্রণ করে যজ্ঞ শুরু করে দিলেন। বশিষ্ঠের যজ্ঞ শেষ হতে দেরী হল না তেমন, ফিরলেন তিনি ইন্দ্রের সভা থেকে। এসে দেখলেন যজ্ঞ শুরু হয়ে গেছে। বশিষ্ঠ অল্পেতেই রেগে যেতেন, কিন্তু এ তো রীতিমত কথার খেলাপ। ভয়ংকর অপমানিত বোধ করলেন, যজ্ঞ বেদীর সামনে দাঁড়িয়ে নিমিকে বললেন, তুমি সামান্য ক্ষত্রীয় হয়ে কুলগুরুরর কথা অমান্য করলে, এর শাস্তি মৃত্যু, আমার অভিশাপ মৃত্যু। কিন্তু নিমিও সহজ জিনিস নন, স্পষ্ট ভাষায় বললেন যে আপনিও কুলগুরু হয়ে, সম্পদের লোভে ইন্দ্রের সভায় গেছেন, আপনি ধর্মচ্যুত হয়েছেন, আমার মৃত্যু হলে আপনারও মৃত্যু হোক।  সেই সময় এইসব অভিশাপ ফলে যেত সাথে সাথেই। মৃত্যু হলো নিমির, বশিষ্ঠেরও। ব্রাহ্মণেরা, যারা পূজা করছিলেন, তারা পড়লেন বড় আতান্তরে, নিমি মারা গেছেন, যজ্ঞ হয় কিকরে, এপাশে যজ্ঞ মাঝরাস্তায় থামানোও যায় না। তারা দেবতাদের কাছে প্রার্থনা করতে লাগলেন নিমির প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু আকাশ থেকে তারা নিমির স্বর শুনতে পেলেন, আমি আমার শরীর থেকে মুক্তি লাভ করেছি, আমার জড়বৎ শরীর ত্যাগ করতেই হত, তা আমি আর ফিরতে চাই না। তা দেবতারাও শুনলেন, বললেন ভালো কথা নিমি, তোমার ইচ্ছে পূর্ণ হোক, তোমাকে আর তোমার নশ্বর দেহে ফিরতে হবে না, কিন্তু তোমার ধার্য জীবৎকালে তোমাকে পৃথিবীতে বাস করতে হবে, সুতরাং তুমি মানুষের চোখ দিয়ে দেখবে। এই কারণে নাকি নিমি আমাদের চোখে দেখার সাথে যুদ্ধ করেন আর সেই কারণেই চোখের পাতা পরে বারবার। সে যাহোক, এদিকে ব্রাহ্মনদের আরেক সমস্যা দেখা দিল, তাহলে রাজা কে হবেন, তারা নিমির মৃতদেহে ঘি মাখিয়ে মন্ত্রোচ্চারণ করতে থাকলেন খুব, আর দেহ মর্দন করতে থাকলেন, তা থেকে জন্ম নিল এক বাচ্চা, এই বাচ্চার নাম রাখলাম তারা জনক, কারণ সে নিজেই নিজের পিতা, আর সব থেকে আসল বলে নাম রাখলেন বৈদেহ, আবার মর্দনের ফলে বাচ্চা জন্মানোয় আরেক নাম হল মিথিলা। এই বংশের রাজাদের নাম এরপর থেকে সবাই জনক। এদের উত্তরসূরি শিরোধব্জও এক যজ্ঞের আয়োজন করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তখন রাজ্যের বাইরে জমি কর্ষণ করতে গিয়ে তিনি এক বাচ্চা মেয়েকে পান। এই মেয়ের নামই সীতা। সে যাহোক সেই গল্পে আমরা যাব না।

অষ্টাবক্র 

আমাদের গল্প বরং শুরু হোক উদ্দালক আরুনির শিষ্য কাহোলাকে নিয়ে। অনেক একে কাহোড় বলেও চেনেন। উদ্দালক অরুনির গল্প আমরা জানি, অত্যন্ত সদাচারী, গুরুর কথা মেনে চলার গল্প। তা কাহোলার বেদের জ্ঞানে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়ে তিনি কাহোলাকে তিনি নিজের মেয়ে সুজাতার সাথে বিয়ে দেন। তা সুজাতা যখন গর্ভধারিনী, তখন কাহোলা তার সাথে সময় কাটানোর জন্য বেদ শেখাতেন তাকে।  মাঝখান থেকে সুজাতা কিছুদিন বাপের বাড়ি থেকে ঘুরে এসেছেন। তা শেখাচ্ছেন একদিন এরকম, এই পড়ানোর মাঝেই উচ্চারণে ভুল হয়েছিল কোথাও, পেটের বাচ্চা ভুল বলে ভুল শুধরে দিল। পেটে থাকাকালীনই সে উদ্দালক অরুণীর কাছ থেকে শুনে এসব শিখে নিয়েছে যখন সুজাতা বাপের বাড়ি ছিলেন। বোঝা যেত ছেলের বয়েস হয়েছে এবং বাবার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবার সময় এসেছে, তখন না হয় বিদ্রোহ করল, এ তো পেটের মধ্যে থেকেই ভুল ধরা শুরু করেছে। কাহোলা তো যাকে বলে রাগে কমলা হয়ে যাওয়ার মত। তিনি অভিশাপ দিলেন, বেয়াদব ছেলে তুই পেটের মধ্যে থেকে বাবার বিরুদ্ধে কথা বলিস! তুই তো হাড় জ্বালানো ছেলে হবে রে! তোকে অভিশাপ দিলাম তুই তোর আটটা বেঁকা হাড় নিয়ে জন্মাবি। তা যাহোক, এ অভিশাপ ফলবে ঠিক সময়ে।  বাকি যা চলছিল ভালোই, কিন্তু কাহোলা গরীব পরিবারের সন্তান। ঘর গেরস্থালির অবস্থাও একান্ত যারপরনাই। তার চলত যজ্ঞ করে আর রাজদরবারে হাত পেতে, তার শিক্ষিত হিসেবে নাম ছিল। ব্যস্ত থাকতে ভালোবাসতেন নিজের অধ্যয়ন নিয়ে। যখন সুজাতা দশমাসের সন্তানসম্ভবা, তখন কাহোলাকে বললেন ঘর যে আর চলে না। কিছু অর্থ উপার্জনের ব্যবস্থা করুন। সন্তানও আসতে চলেছে, তার প্রতিপালনের খরচপাতিও দরকার। অগত্যা কাহোলা চললেন রাজদরবার। রাজা জনকের দরবার। সেখানে জ্ঞানী গুণীর সমাহার। বন্দিন নামের এক বাগ্মী আছেন সেখানে, তিনি জ্ঞানীদের তর্কযুদ্ধে আহ্বান করেন। তাকে হারাতে পারলে মেলে খেতাব আর উপঢৌকন। কিন্তু শর্ত আছে ভয়ংকর। তর্কযুদ্ধে হারলে তাকে সঙ্গম নদীতে ডুবে মরতে হবে। কাহোলা তর্কযুদ্ধে হারলেন, শর্তস্বরূপ তাকে ডুবে মরতে হল নদীতে। এখানেও গল্প আছে কিছু। আসলেই কি মরলেন? ফেরত আসব আবার পরে সেই গল্পে।

হাহাকার নিয়ে সুজাতা ফেরত গেলেন বাপের বাড়ি। যথাসময়ে ছেলে জন্মালো, কাহোলার অভিশাপ সমেত।তার শরীরের আটটি হার বেঁকা। তাই তার নাম হল অষ্টাবক্র। সেখানে অরুণীর কাছেই মানুষ হলেন তিনি। তিনি তার বারো বছর অবধি জানতেন উদ্দালকই তার বাবা, আর উদ্দালকের ছেলে শ্বেতকেতু তার ভাই। একদিন উদ্দালকের কোলে বসে আছেন, শ্বেতকেতু এসে বায়না ধরল, সে বাবার কোলে বসবে।কিন্তু অষ্টাবক্রও ছাড়বে কেন, সেও নড়বে না। কিছুক্ষন খিটিমিটি বাধার পর শ্বেতকতু কিছুতেই এটে উঠতে না পেরে বলল উদ্দালক তার বাবা, সে তার বাবার কোলে বসব, অষ্টাবক্র নিজের বাবার কোলে গিয়ে বসুক যে যাক। অষ্টাবক্র প্রথম জানল যে উদ্দালক তার বাবা নয়। তা জেনে সে কাঁদতে কাঁদতে মাকে গিয়ে ধরল, বলল বলো আমার বাবা কে। কোথায় আমার বাবা। সুজাতা বুঝিয়ে বললেন সব। অষ্টাবক্রের চোয়াল শক্ত হল। সে রাজদরবার যাবে, বন্দিনকে তর্কে হারাতে হবে তাকে।নিতে হবে পিতার মৃত্যুর প্রতিশোধ। এই জায়গায় আরো খানিক গল্প আছে, কিকরে সে রাজার কাছে পৌঁছাল। সে গল্প যারা জানতে ইচ্ছুক পড়ে নেবে। তা অষ্টাবক্র যখন রাজার সভায় ঢুকছে, সবাই তার অদ্ভুত ভাঙাচোরা চেহারা দেখে হেসেই অস্থির। বারো বছরের অদ্ভুত ভঙ্গিমার বালককে রাজসভায় প্রবেশ করতে দেখে লোকে হাসবে বটে, তাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু সে রাজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল, তারপর বলল, মহারাজ আমি তো ভেবেছিলাম পন্ডিতদের সভায় প্রবেশ করেছি, কিন্তু যারা দেহ দেখে মানুষের বিচার করে তারা তো মুচীরও অধম। মহারাজ বারো বছরের বালকের মুখ থেকে এত স্পষ্ট বাক্য শুনে অবাকই হলেন, কিন্তু বাকি সভাসদদের রুষ্টও করতে চাইলেন না। বললেন, কে তুমি? কি চাও ? অষ্টাবক্র স্পষ্ট উত্তর দিল, আমি বন্দিনের সাথে তর্কযুদ্ধে লড়তে চাই। মহারাজ আরো অবাক হলেন, বারো বছরের বালক, সে কিনা লড়তে চায় বনদিনের সাথে! সে তো এক অসম যুদ্ধ, তারও আগে, এ বালক সম্পর্কে তিনি জানেনও না কিছু। মহারাজ বললেন, কে তুমি? অষ্টাবক্র বললো, আমি ঋষি কাহোলার পুত্র অষ্টাবক্র। আমার পিতার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে চাই। মহারাজ বললেন, তুমি জানো তাহলে তর্কযুদ্ধে পরাজয়ের ফল কি, কিন্তু সে তো অসম যুদ্ধ হবে। সে আমি হতে দিতে পারি না। অষ্টাবক্র বলল, মহারাজ, আপনি যাচাই করে নিন আমি উপযুক্ত কিনা! মহারাজ ভাবলেন আচ্ছা জ্বালা, এ তো কিছুতেই ছাড়ে না। বাচ্চা বটে, তবে কথাবার্তা স্পষ্ট, তায় বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে এসেছে। যাচাই করতেই হয়। মনে প্রশ্ন ভেবে নিলেন শিরোধব্জ। বললেন বলো দেখি কার ৩৬০ টা  শিক, ১২ টা ভাগ, ২৮ টা সন্ধি আর ৩০ অংশ? অষ্টাবক্র বলল, মহারাজ সময় আপনার সাথে থাক, আপনি যার কথা বলছেন, তা আর কিছু নয়, কালচক্র। মহারাজ ভাবেননি এর উত্তর এই বালকের মুখ থেকে পেয়ে যাবেন, এর পর তিনি পরপর আরো কয়েকটা প্রশ্ন করলেন। বল তো কে চোখ খুলে ঘুমায় ? কার প্রাণ নেই? জন্মের পর নড়ে না কে? কি নিজের বেগে বাড়ে ? অষ্টাবক্র পরপর উত্তর করলেন, মাছ, পাথর, ডিম, নদী। সমস্ত প্রশ্নের উত্তর সঠিক। মহারাজ ফাঁপরে পড়লেন, কিন্তু যোগ্যতার খাতিরে সে লড়তে চাইছে, তাকে আর না বলা যায় না। তিনি আদেশ দিলেন বন্দিনকে রাজসভায় নিয়ে আসার জন্যে।

তর্কযুদ্ধ

তখননকার তর্ক কেমন হত আমার জানা নেই। তবু দিনের শেষে এখন যাদের তর্ক করতে দেখি, সেরকমই হয়েছিল হয়তো। বন্দীন রাজসভায় এলেন।ধীর মৃদু গতি তার।এই রাজসভা তার বাগ্মিতা দেখেছে।হেঁটে আসার সময় তার প্রতিফলন হল আশেপাশের সভাসদদের চোখে মুখে। মহারাজের সামনে ঋজু ব্যক্তিত্বে ঝুঁকলেন একটু। মহারাজ বললেন বন্দীন, এ হল অষ্টাবক্র, আপনার সাথে তর্কযুদ্ধে লড়তে চায়। মহারাজ পিতার পরিচয় দিলেন না। তাইই সাব্যস্ত। রাজসভায় নিজের পরিচয়ই বড়, কর্মক্ষেত্রে যা হওয়া উচিৎ। বন্দিন ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন অষ্টাবক্রকে। চোখাচুখি হল দুজনের। দুজনেরই শান্ত শীতল চোখ।অষ্টাবক্রের চোখ ঈষৎ মুদিত, শান্ত, কিছক্ষন আগে যে ক্রুদ্ধ ভাব ছিল, তা সরে যুদ্ধের শান্ত প্রস্তুতি এসেছে তাতে।বন্দীন ঘুরলেন আবার মহারাজের দিকে, বললেন, মহারাজ বালক শর্ত জানে তো? মহারাজ বললেন হ্যা, সে অবগত। এই হয় সামনে কুশলী ভাষা নিয়ে দাঁড়ালে বোধহয় বাকি সবার ভাষাও আরো মার্জিত হয় কিছু। বন্দীন ঘুরলেন। মনে মনে যে ডেঁপো ছোকরা ভেবেছেন তা তার দেহভঙ্গিমায় ফুটল না একটুও। নিয়ম বাধা তর্কের। একজন সংখ্যার মাহাত্ম্য নিয়ে শ্লোক বলবেন, অন্যজনকে তা শেষ করতে হবে বা পরের সংখ্যার গুরত্ব বুঝিয়ে অন্যজনকে শ্লোক দিতে হবে খন্ডানোর জন্য। তা আমি এখানে পুরো শ্লোক লিখব না। সে লেখা যাবে আরেকদিন। তো একের পর এক শ্লোক চলতে থাকল, বন্দীন শ্লোক দেন, মুহূর্তে আরো গুরুত্বপূর্ণ জিনিস দিয়ে সেই শ্লোক শেষ করে অষ্টাবক্র। আট থেকে নয় নম্বর সংখ্যার মধ্যে বন্দিনের গতি ধীর হয়েছে, কপালে ভ্রূভঙ্গী এসেছে। বোঝাই যাচ্ছে যে সামনের প্রতিপক্ষ চাপে ফেলেছে তাকে। ১২ নম্বর সংখ্যায় একটু ইতস্তত হলেও, ছুড়ে দিলেন গোছানো শ্লোক। অষ্টাবক্র যেন আজীবনের প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে। ১৩ নম্বরে এসে বললেন পৃথিবীতে তেরোটি দ্বীপ আছে; বছরে তেরোটি চান্দ্র মাস (মলমাস সহ*) হতে পারে; তেরো নম্বর তিথি পবিত্র.. থামলেন সামান্য, কিন্তু তার আগেই তড়িৎগতিতে অষ্টাবক্র বলে গেলেন বেদের অতিচ্ছন্দ নামক ছন্দে ১৩টি অক্ষর থাকে এবং শাস্ত্রে ১৩টি বিশেষ যজ্ঞের বিধান আছে। সভায় হুলুস্হুলু পড়ে গেল, অষ্টাবক্র জিতে গেছে, বন্দিনকে হারিয়েছে। সারা সভা জুড়ে হৈচৈ, মহারাজ শিরোদ্বজ এক হুঙ্কারে বললেন শান্ত। সভা শান্ত হল। মহারাজ অষ্টাবক্রকে বললেন অভিবাদন দেব। তারপর বন্দিনের দিকে ফিরে বললেন, তাহলে তো শর্ত আপনি জানেন দেব। বন্দিন হারেননি কারো কাছে এযাবৎ, হারকে স্বীকার করছিলেন প্রানপনে, মহারাজের দিকে তাকিয়ে বললেন, মহারাজ, আমি সঙ্গমাতে ডুবলেও আমার মৃত্যু হবে না। এর আগে পর্যন্ত আমি যাদের হারিয়েছি, তাদেরও মৃত্যু হয়নি মহারাজ। আমি বরুণদেবের পুত্র, বরুণদেব বিরাট করে যজ্ঞের আয়োজন করেছেন, বারো বছর ধরে এবং তার জন্যে তার বারোজন পন্ডিতের প্রয়োজন ছিল। আমার কাজ ছিল পন্ডিত জোগাড় করা, আপনার সভার থেকে ভালো আর কোথায় তা হতে পারত মহারাজ, ধৃষ্টতা মাফ করবেন। অষ্টাবক্রের দিকে তাকিয়ে বললেন আমি তোমায় চিনেছি, তুমি সঙ্গমের তীরে যাও, সেখানে তোমার পিতাকে ফেরত পাবে। এ শুনে অষ্টাবক্র তার টেরাব্যাকা শরীর নিয়ে মরুর লাগালেন সঙ্গমার্ তীরে। কিন্তু দেখেননি তো কাহোলাকে দেখলেও চিনবেন কি করে। কিন্তু কাহোলা সঙ্গমা থেকে উঠে দেখলেন টেরাব্যাঁকা শরীর নিয়ে নদীর তীরের দিকে ছুটে আসছে এক বালক। খুব চিনলেন কাহোলা, নিজের সাপের কথা তার দিব্যি মনে আছে। কিন্তু বরুণদেবের জকাছে শুনেওছেন পুত্রের গুনগান। কাছে আস্তে নিজেই এগিয়ে জড়িয়ে ধরলেন তাকে, তারপর বললেন তুমি সঙ্গমাতে ডুব দাও। তা বাবার আদেশে যখন অষ্টাবক্র নদীতে ডুব দিলেন, তার আটটি বেঁকা হাড়ই সোজা হল। আর সাথে সাথে আমারও নটে গাছটি ফুরালো।

জনকের প্রশ্ন 

অষ্টাবক্র শ্বেতকেতু আর বাবার সাথে প্রথমে ফিরলেন উদ্দালকের আশ্রমে।  সুজাতার আনন্দ দেখে কে। মৃত স্বামী ফেরত এসেছেন, সাথে ছেলের সমস্ত বিকৃতি গেছে। অনিন্দ্যসুন্দর চেহারা নিয়ে ফেরত এসেছে সে। আনন্দের চোটে একরাশ কেঁদেই নিলেন তিনি। তা বেশীদিন তো শ্বশুর বাড়ি থাকা যায় না।ছেলে বৌ নিয়ে নিজের আশ্রমে ফিরলেন কাহোলা। আশ্রমের একাকার অবস্থা, অষ্টাবক্র বাবার সাথে আশ্রম সাজিয়ে গুছিয়ে নিলেন। এরই কিছুদিনের মধ্যে রাজসভা থেকে জনক দূত পাঠালেন তার সভায় আমন্ত্রণ জানিয়ে, স্বয়ং রাজার পরামর্শদাতা হিসেবে যোগ দিতে। সুজাতা কেঁদেকেটে একরাশ করলেন ছেলের বয়স ষোলোও হয়নি, তারই মধ্যে ছেলেকে ছেড়ে দিতে হবে, সুজাতা জানেন একবার কর্মজীবনে ঢুকলে আর ফেরত আসে না ছেলেরা। কাহোলা কিন্তু খুশি হলেন খুব। পুত্রখ্যাতি কার না পছন্দ হয়। ছেলের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে দিগ্বিদিক, সবাই এখন অষ্টাবক্রকে কাহোলার পুত্রের চেয়ে, কাহোলাকে অষ্টাবক্রের বাবা হিসাবে জানে বরং। কাহোলা খুশি মনে অনুমতি দিলেন অষ্টাবক্রকে রাজসভায় যোগদানের জন্য।



টীকা:
১. 
হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে সাধারণত প্রতি ৩২ মাস অন্তর যে অতিরিক্ত চান্দ্র মাস বা "অধিকমাস" আসে, তাকেই মল মাস বা পুরুষোত্তম মাস বলা হয়। 
২. আমার শেষ লাইনটা উপেন্দ্রকিশোরের প্রতি আমার ভালোবাসা। বাবা ছোটবেলায় উপেন্দ্রকিশোর রচনাসমগ্র কিনে দিয়েছিল, তাতে মনে পড়ে কিছুটা ছোটদের পুরান ছিল। পরে বড় হয়ে ছোটদের রামাযান, ছোটদের মহাভারত পড়েছি।  কিন্তু একেবারে বাচ্চা বয়সে জন্মদিনের সেই বইটার স্মৃতি গল্পে ডুবে যাওয়ার একটা ভয়ানক আনন্দের কথা মনে করায়। 



1. https://indiaspiritual.wordpress.com/2020/04/04/ashtavakra-and-vandin/
2. https://www.vyasaonline.com/2018/04/27/ashtavakra/mahabharata/#:~:text=He%20was%20there%20defeated%20in,it%20a%20secret%20from%20Ashtavakra.%E2%80%9D
3. https://indiaspiritual.wordpress.com/2020/04/04/ashtavakra-and-vandin/#:~:text=Vandin%20said%20that%20he%20was,discipline%20or%20philosophy%20of%20Vedanta.
4. https://inbrindavan.com/nimi-janaka-seerahdwaja/


Saturday, September 20, 2025

প্রলাপ

 যখন চারপাশ সামান্য শান্ত হয়ে আসে। নিঝুম হয়ে আসে শহর। তখন গুটি গুটি পায়ে চেয়ার টেনে বসি টেবিলের সামনে, প্রশ্ন করি। যা মাথায় আসে, তার অনেকটাই লেখা হয়ে ওঠে না। লিখলে প্রশ্ন করি, কাউকে এই ভাবনাগুলো দেখিয়ে কি লাভ? সেই প্রশ্নে লাভ নামক শব্দটার দৌড়াদৌড়ি এত বেশী যে প্রশ্নটাই ক্লান্ত হয়ে পরে। এ. আই. এর চটজলদি তৈরী লেখার মধ্যে এত সময় নিয়ে লেখার কি মানে আছে? এইসব সমস্ত প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই। তবুও পুরোনো অভ্যাসে লিখি এখনো। যদি চিন্তা ভাবনাকে পরবর্তী প্রজন্মে পাঠানোর দায় লেখার হয়, তা বোধহয় এ. আই খারাপ করেনা। উত্তর দিতে পারে, তর্ক করতে পারে, যুক্তি দিয়ে কথাবার্তা ভেঙে দেখতে পারে। তাহলে? নিজের মত করে সাজানো কিছু যুক্তি আমার আছে, যেমন এ. আই. চলতা ফিরতা মানুষ নয়, তাদের আবেগ নেই, ভাবালুতা নেই, কিন্তু যত দেখি তত আরো উল্টো যুক্তি মাথায় আসে। ইদানীং দেখলাম Claude নাকি কথাবার্তায় অনেক বেশী empathy দেখায়। যাহোক, আমি এসব নিয়ে লিখতে বসিনি, অজুহাত লিখছি, কারণ বহুদিন কোথাও বাংলায় দুটি শব্দ লিখে দেখাই নি কাউকে, এই লেখাটা শেষ হয়ে গেলে আমি কোথাও একটা পোস্ট করব। লেখার শুরুতেই এইসব ভাবনাচিন্তা আসে, সেগুলো দিয়েই বলে দিই যে লেখার ইচ্ছে এবং দেখানোর ইচ্ছে থেকেই লেখা। 

এর পরের ভাবনা আমি আপাতত কি নিয়ে লিখব ? কোনো নিয়ম নেই, যা ইচ্ছে লিখব। সুতরাং, যদি কেউ এই লেখাটা পড়ে, তাকে উত্তর দেওয়ার দায় আমার নেই, সে স্বাধীন সিদ্ধান্তে পরের প্যারাগ্রাফ গুলো পড়বে। 

 প্রলাপ 


এখান থেকে সমুদ্র দূরে নয়। মাঝে মাঝে হালকা গরম হাওয়া বয়ে যায়, শরীরে ঘাম। এইসব ওতপ্রোত নিয়মের মাঝে রাস্তা বড় ব্যস্ত। তার মধ্যে পান সিগারেটের দোকান, সেখানেও সবাই ব্যস্ত। নিয়মের হেরফেরে কখন যেন একটা পুরোনো বাড়ি, আর সেটায় তালা। সেও এসেছে বোধহয় দূরের কোথাও থেকে, আটপৌরে চালা। এর মধ্যে একটা দুটো ফলের দোকান, এটা সেটা পশরা সাজিয়ে বসে কিছু লোক। তার মধ্যে দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে দাঁড়িয়ে থাকি অবিন্যস্ত। চেনা রাস্তার বাইরে আজকাল যাওয়া মুশকিল, সেই অচেনা রাস্তাগুলো আরো বেশী অচেনা। তার মধ্যেই দেখি একজন রোজ ঢুকে যায়, এই লোকটাকে আমি চিনি, ওকে রোজ দেখি নানা জায়গায়, নানা রাস্তায়, নানা সময়, একইসাথে বসে আছে। ওই লোকটাই ওই লোকটার সাথে গল্প করছে। এদের পেরিয়ে যাই হাঁটাপথে, শহর পেরোতে পারি না। তবু কিছুটা পেরোলে আবার শান্ত এক রাস্তায় আসি, সেখান নিয়ম বড় বেশী। এখানে সবুজ বেশী, তবু বড্ড গোছালো, মানিয়ে নিতে সময় লাগে। কে একটা হিসেব বলেছিল নাকি একশো মানুষে এক সবুজ। আমি বুঝিনি, কঠিন হিসেব। আরেকটু এগিয়ে গেলে সবুজের মধ্যেই ডুবে যাওয়া যায়। কিন্তু সেখানে পাঁচিল আছে, সে পাঁচিল টপকানো যায় না। দূর থেকে সবুজ দেখি খানিকক্ষণ। তারপর শান্ত হয়ে বসি, ভাঙাচোরা চেনা জিনিসপত্রকে কিছু এদিক ওদিক করি, মাঝে মাঝে একটা দুটো তৈরীও হয় কিছু, কোনো কোনোদিন হয় না। কিছু লোকজন আসে, সবাই ভাঙা কাঠখড় খোঁজে, সবাই কিছু চাওয়া বোঝে, কিছু পাওয়া বোঝে। আমিও। কিছু বুঝি, কিছু বুঝি না। এইসব শেষ হলে, শান্ত বিকেল নামে নিজের দায়ে। সে বিকেলের তেমন কিছু নেই, এপাশ চায়, ওপাশ চায়, সন্ধ্যা আঁকড়াবে বলেই বোধ হয়। বিকেলের একটা নিজস্ব স্রোত আছে, সেই স্রোতে দেখি শান্ত রাস্তাও আবার সামান্য ব্যস্ত হয়। সবাই সন্ধ্যের দিকে যায় বোধহয়। আমিও সন্ধ্যে জড়িয়ে ঘরে ফিরি। ততক্ষনে আলো জ্বলে চারপাশে। 


গাল ছুঁয়ে, ছাদ ছুঁয়ে যে আধার নামে
তারই নাম ভালো, সাথে অল্প কিছু কালো।

রোজ পৃথিবীর এলোমেলো ছাদ থেকে তারা গুনি। তারারা বড্ড বেহিসেবি, কখন কে কার ঘাড়ে, কে কার মাথায় চেপে যায়, বুঝি না। তার মাঝে ফুটন্ত উল্কির মত ছুটে যায় এরোপ্লেন। বাড়ির সামনেটায় একটা গাছ আছে, সেই গাছের নীচে অন্ধকার জমে থাকে। আলো যায় না। তার সামনেটা পেরোই, বৃষ্টি হয়েছিল কখন ? জল জমে থাকে। সেই জলের চারপাশ জুড়ে বেগনি রঙের লতা, ছটাক লালও ছড়ানো, রাতের ঝাপসা আলোয় পুরো বোঝা যায় না। ব্যস্ততা ক্লান্ত হয়েছে তখন। মাথার কাছে, বালিশের পাশে কোনো চেনা বই খুঁজে পাই না। অচেনাগুলোই কখন যেন চেনার জায়গা নিয়ে নিয়েছে জোর করে। বকি না আর, সেগুলোই ছুঁয়ে, কখন যেন দুচোখ জুড়ে কুয়াশা হয়। সেই কুয়াশা নামে শরীর জুড়ে। এইসব  আর মনে থাকে না। 



Saturday, January 11, 2025

তোকে

তোকে আমার সবটা দিলাম। 
হিমেল শীতল নদী। 
আমার নিজের আর কিছু নেই
বুঝতে পারিস যদি। 

অল্প কিছু আগুন ছিল 
শরীর জুড়ে রোজ। 
তোকে বোধহয় দিয়ে ফেলেছি 
সামান্য তার খোঁজ। 

তবুও রোজ স্বপ্ন দেখি বাঁচব তোর সাথে 
হাজার ভুলেও হাত থাকে তোর হাতে। 

ভুলও দিলাম, ঠিকও দিলাম যদি কিছু থাকে। 
সামান্য নয়, বাঁচিয়ে রাখে ভালোবাসা আর
ইচ্ছেরা সব , আগামীর স্বপ্ন আঁকে। 



 

Sunday, October 13, 2024

শৈশব

চারপাশ আলো কালো বড়।
তোমাকেও সে তার গল্প শোনালো। 
গল্প শুনব বলে রোজ 
হারানো খাতার খোঁজ।

কোথায় কানের পাশে উদ্ধৃতি হবে 
বিলের পাশ কেটে উড়ে যাবে ঝোড়ো বাতাস। 
সেসব কিছু নয়, শৈশব গোনে সব 
পুরোনো স্মৃতি বড় আবছায়া দাগ কাটে। 

নিজের কলম পাশ। 
পিছু পিছু একা হাঁটে।

তোমাকেও রঙিন রেখেছিল জল।
ভাগ্যিস বলেনি কেউ ধুলোর ফসল।
আজ আধো কথা বুনে বুনে স্বর অল্পে হারালো। 
কিছু গল্পে হারালো। 

অক্টোবর ১৪, ২০২৪

Monday, July 1, 2024

তাকে

দুচোখে ভরে আসে সেই স্বাদ। 
তাকে কিছুই বলা হয়নি। 
ওতোপ্রোতো শব্দের স্রোতে 
তাকে এই সব শরীর ছোঁয়া কথা 
বলা হয় নি। 

বলা হয় নি, দুচোখ মন শরীর জুড়ে 
কত কি দেখেছি আমি। 
কত কি পেয়েছি।

বলা হয়নি সূর্যতাপ রোজ ফসলের মত 
আমার দুচোখ ছুঁয়ে যায়। 
বলা হয়নি আমার আলোরেখা 
আমারই মতন
শরীর ছুঁতে চায়,
সামান্য কিছু মন। 

এসব কারণ অকারণ দল বাঁধে 
তাকে বলা হয়নি। 
এই যে সব কবিতার দল ছাপা হয়নি কখনো। 

কেউ জানবে না, পড়বে না কোনোদিন
তাদের মতই, সেইসব কথা তাকে বলা হয়নি। 
হয়তো হবেও না কোনোদিন। 

তারপরেও আমি এইসব শব্দ জুড়ে লিখব তার নাম 
তাকে ঘিরে আসবাব সাজাব থরে থরে 
তাকে ঘিরে রাখব ভীড়ে। 
তারপরেও সে কি কখনো বুঝবে সামান্য কিছু তার 
আমারও ছিল, সামান্য দুঃখ, রাগ, ভয় ?
তার কি কখনো দিনের শেষে এইসব মনে হয় ?

আমি নিজের মনে আলোকবর্তিকা লিখি। 
রোজ নানা ধাধাঁর শেষে 
আবারও নতুন কিছু শিখি। 
এইসব ভীড়ে সেও থাকে 
সে জানেনা তাই 
সমস্ত কলহ সংগ্রাম শেষে 
আমার শুধুই তাকে চাই। 

জুন ৮, ২০২৪

Thursday, June 20, 2024

যত দূরে যাই
কাছে কাছে আসি। 
যত দূরে যাই 
তত ভালোবাসি।

তোর কাছে থাকে যেন
অন্ধকারে আলো। 
ভালোবেসে ভীষণ
মুছে দিস সব অচেনা, অপ্রয়োজন।

জুনে ২১, ২০২৪

Friday, June 7, 2024

কে যেন কস্তুরী বলে গেছে। 
আমাকে ঘিরে থাকে সেই স্বাদ। 

আমাকে ঘিরে থাকে পুরোনো বিবাদ। 
সেই শর্ত, কিচ্ছু পায়নি সে। 
যদি ভালো থাকে। 

যেতে দেওয়া ভালো। 
কাঁচের ঘরের যত অন্ধকার আলো 
একরাশ জোনাকি জ্বালালো। 

ভালো থাকে যেন। 
যেমন ছিল ঝগড়ুটে, রাগী
একটু মনভোলা
সবকিছুতে তার প্রশ্ন ছিল কেন ?
ভালো থাকে যেন। 

জুন ৭, ২০২৪